জাতীয়

মহামারির মধ্যেও রাজপথে দাঁড়িয়ে প্রিয়জনের জন্য আর্তনাদ

2020/08/post_thumb-2020_08_30_12_49_04.jpg

অলিউল্লাহ নোমান

আজ ৩০ আগষ্ট। গুমের শিকার হওয়া মানুষদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস। গুমের শিকার হওয়ার পর তাদের হদিস কেউ জানেন না। আপনজন ফিরবেন। পরিবার থাকেন এ অপেক্ষায়। দরজায় কড়া নাড়লেই দৌড়ে যান। এই বুঝি ফিরে এসেছেন! কিন্তু না। হতাশ হন প্রত্যাশায় থাকা অতি আপনজন। এমন প্রত্যাশা ও হাহাকার বছরের পর বছর বিরাজমান প্রতিটি পরিবারে। অনুরুপ গুমের শিকার মানুষদের ষ্মরণেই জাতিসংঘ ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক দিবস। এই দিবসকে সামনে রেখেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে যুক্তরাজ্য থেকে নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে আমার দেশ। প্রথম দিনের পত্রিকাটি সাজানো হয়েছে গুম রাজ্য বাংলাদেশের গুমের ঘটনা ও পরিবারের সদস্যদের অনুভুতি দিয়ে।

২০১০ সালের ৯ জুন। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ততকালীন ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমকে ধরে নিয়ে যায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে একদল লোক। ঢাকার ইন্দিরা রোডের বাসার গেইট থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। এরপর থেকে নিখোজ। পরিবারের লোকরা জানেন না তাঁর ভাগ্যে কি ঘটেছে। চৌধুরী আলম ফিরবেন, এই প্রত্যাশায় অপেক্ষার পালা ১০ বছর অতিক্রম করেছে। চৌধুরী আলম কি ফিরবেন? এমন প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই।

২০১২ সালে ১৭ এপ্রিলে রাতের অন্ধকারে বনানী থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীকে। গাড়ির চালক আনসার আলীকেও নিয়ে যাওয়া হয় ইলিয়াস আলীর সাথে। গাড়িটি দরজা খোলা অবস্থায় পড়েছিল বনানীর সে রাস্তায়। এ দুজনের খোজ আর মিলেনি।

২০১৬ সালের ৩ আগষ্ট দিনে দুপুরে ঢাকার ব্যস্ততম আদালত পাড়া থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সাবেক নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে। আদালত পাড়ার রাস্তায় মানুষের ভীড় থেকে তাঁকে যারা ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তারা নিজেদের পরিচয় দেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিশাবে। ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ৮ মাস তাঁর কোন খোজ মিলেনি। টানা ৮ মাস পরিবারে ছিল উদ্বেগ। ৮ মাস গুম করে রাখার পর ছেড়ে দেয়া হয় তাঁকে। কিন্তু কোথায় কিভাবে রাখা হয়েছিল, মুক্তির পর এনিয়ে মুখ খোলেননি তিনি।

২০১৬ সালের ৯ আগষ্ট নিজের ঘর থেকে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ব্যারিষ্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমানকে। তাঁর পিতা জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মীর কাশেম আলী। তাঁকে ফাঁসি দেয়ার মাস খানেক আগে ধরে নিয়ে গুম করা হয় ছেলেকে। সুপ্রিমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সদস্য ব্যারিষ্টার আরমান। বিলেত থেকে ব্যারিষ্টার ডিগ্রী অর্জন করেছিলেন। ঢাকার ডিও এইচ এস-এর বাসা থেকে যারা তাঁকে জোর করে নিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তারা নিজেদের পরিচয় দেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। ধরে নিয়ে যাওয়ার ৪ দিন আগেও রাতে র‌্যাব এসেছিলেন ইউনিফর্ম অবস্থায়। সেদিনও আরমানকে বলা হয়েছিল তাদের সাথে যাওয়ার জন্য। আইনি পদক্ষেপ ছাড়া যেতে রাজি হননি। ওই রাতে র‌্যাব সদস্যরা চলে যায়। কিন্তু পরের রাতে এসে আর ফেরতন যাননি। তাঁকে সঙ্গে নিয়েই বের হন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে। বাসার সামনে সাদা মাইক্রোবাসে উঠানোর পর থেকে আরমান নিখোজ। পরিবারকে আজো জানানো হয়নি কোথায় রাখা হয়েছে তাঁকে।

২০১৬ সালের ২২ আগষ্ট রাত ১২টার দিকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রিগেডিয়ার আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে। সেনাবাহিনীর সাবেক এ ব্রিগেডিয়ার আজমীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় মগবাজারের বাসা থেকে। তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খুলে নেয়া হয় বাড়ির আশে পাশের সব সিসিটিভি ক্যামেরা। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ৮/১০টি গাড়ি প্রবেশ করে মগবাজারের কাজি অফিস গলিতে। বিদ্যুত বন্ধ করে দেয়া হয় আশে পাশের রাস্তায়। এভাবে কত রাজনৈতিক নেতা বা ভিন্নমতের লোকদের ধরে নিয়ে গুম করা হয়েছে, সেটার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। রোম সংঘবিধি অনুযায়ী গুম করা মানবতা বিরোধী অপরাধ। অথচ, ২০০৯ সাল থেকে বহু মানুষকে গুম করা হয়েছে। তাদের কোন হদীস কোথায়ও নেই।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ১৯ জন বিরোধী দলীয় নেতা কর্মীকে ধরে নিয়ে গুম করা হয়। ৪ ডিসেম্বর (২০১৩) এক রাতেই ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ৮ জনকে। র‌্যাবের পরিচয় দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাদের। ৪ ডিসেম্বর (২০১৩) রাত সাড়ে ৮টা তখন। র‌্যাবের গাড়ি এসে থামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই-ব্লকে একটি নির্মানাধীন বাড়ির সামনে। সেখান থেকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩৮নং ওয়ার্ড বিএনপি‘র সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন (৩৪), তাঁর খালাত ভাই জাহিদুল ইসলাম ওরফে তানভীরসহ (৩০), পূর্ব নাখালপাড়ার বাসিন্দা আবদুল কাদের ভূইয়া ওরফে মাসুম (২৪), পশ্চিম নাখালপাড়ার মাজহারুল ইসলাম ওরফে রাসেল (২৪) মুগদার আসাদুজ্জামান ওরফে রানা (২৭) ও উত্তর বাড্ডার আল আমিনকে (২৬) ধরে নিয়ে যায়, র‌্যাব পরিচয় দিয়ে। একই রাতে শাহিনবাগের বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় এ এম আদনান চৌধুরী (২৮) ও কাওসার হোসেনকে।

তাদের স্বজনরা জানান, যারা তাদের তুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাদের পড়নে ছিল র‌্যাবের পোশাক। ইউনিফর্মে লেখা ছিল র‌্যাব। গাড়িতে র‌্যাব লেখা স্টিকারও ছিল। তাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত কোন খোজ মিলেনি। স্বজনরা র‌্যাবের অফিসে অনেক ধরনা দিয়েছেন। কিন্তু তাদের সাথে নানা ছলচাতুরি করা হয় তখন।

ধরে নেয়ার পর গুমের শিকার সাজেদুল ইসলাম ওরফে সুমনের মা, হাজেরা খাতুন এ প্রতিবেদককে জানান, র‌্যাব প্রথমে স্বীকার করেছিল তাদের উঠিয়ে নেয়ার বিষয়টি। র‌্যাব-১ এর ততকালীন অধিনায়ক তাদের জানিয়েছিলেন, ৮ তরুণকে গোয়েন্দা শাখার পরিচালকের কাছে হস্থান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়। নির্দেশ মোতাবেক গোয়েন্দা শাখার ততকালীন পরিচালক আবুল কালাম আযাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

উল্লেখ্য, র‌্যাবের ততকালীন গোয়েন্দা শাখার পরিচালক আবুল কালাম আযাদ পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ সিলেটে শিবাবাড়ি পাঠানপাড়ায় এক অভিযানে গেলে বোমা বিস্ফোরণে আহত হন। পরবর্তীতে মারা যান।

সুমনের মা হাজেরা খাতুন (৭৩) জানান, ছেলের খোজে বছরের পর বছর র‌্যাবের অফিসে গিয়েছেন। কখনো র‌্যাব-১ এর কার্যালয়ে। কখনো গিয়েছেন র‌্যাব সদর দফতরে। দিন, মাস, বছর ঘুরেও ছেলের সন্ধান পাননি। কান্না জড়িত কন্ঠে হাজেরা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে বাইচ্যা আছে, না মইর‌্যা গেছে, ওইটাই তো জানি না বাবা! র‌্যাব-পুলিশ কোথায়ও যাওয়ার বাকী রাখি নাই। সব জায়গায় গেসি। আমার ছেলে তো কোন দোষ করে নাই। মনে প্রাণে বিএনপি করতো। আল্লাহর কাছে শুধু বলি, আল্লাহ আমার ছেলেকে দেখাও। আমরে তুমি আমার ছেলের মুখ না দেখাইয়া নিও না আল্লাহ।‘

ভাইয়ের খোজে মায়ের সাথে বিভিন্ন দফতরে ঘোরাঘুরি করেছেন সাজেদুল ইসলাম সুমনের বড় বোন মারুফা ইসলাম ফেরদৌসি। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইকে নেয়ার পর আমরা প্রথমেই যাই র‌্যাব-১ কার্যালয়ে। তারা ভেতরেই ঢুকতে দেয়নি। সারারাত সেখানেই ছিলাম। ওখান থেকে যাই সদর দফতরে। সেখানেও কেউ দেখাই করেনি। রাস্তায় ঘোরাঘুরিতেই দুই দিন ২ রাত কেটে যায়। র‌্যাব-১ এর ততকালীন সিইও কিসমত সাহেব তখন জিয়া সাহেবের নাম্বার দেন। নাম্বারটা দিয়ে বলেন, ওনার সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু জিয়া সাহেবের সাথে যোগাযোগ করলে কখনো হাসিমুখে আবার কখনো হেয়ালি কথাবার্তা বলতেন। কোন দিন হাসিমুখে বলেছেন, আমরা তো খুজতেছি। একদিন বললেন, কত লাশ তো বরিশালের ওই নদীতে…, কত লাশ তো সেখানে। কোথায় খুজবো!

তিনি জানান, র‌্যাব-১ তখন স্বীকার করেছিল, তারা আমার ভাইকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। তারা আমার মায়ের সামনে স্বীকার করেছে, হ্যা আমরা নিয়ে এসেছি।



বাবার অপেক্ষায় মেয়ে

সাজেদুল ইসলাম সুমনের মেয়ে হাফসা ইসলাম রায়তা। এখন দশম শ্রেনীর ছাত্রী। পিতাকে যখন উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, রায়তা ছিলেন তখন তৃতীয় শ্রেনীতে। ৭ বছর ধরে বাবাকে খুঁজছেন মেয়ে। বাবার খোজে শিশু থেকে কিশোরী বয়সে এখন। রায়তা বিশ্বাস করেন, বাবা বেচে আছেন। একদিন না একদিন ফিরে আসবেন। কাছে থেকে বাবা বলে ডাক দেবেন। রায়তার ছোট বোন ছবি দেখে বাবাকে খোজেন!

ছেলের খোঁজে মর্গে মর্গে ঘোরেন মা

২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজনৈতিক সহকর্মীকে দেখতে গিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের ৫ কর্মী। তাদের মধ্যে ছিলেন সূত্রাপুর ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি খালেদ হাসান হোহেল, সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সম্রাট মোল্লা, ৭৮ নাম্বার ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি আনিসুর রহমান খান, একই ওয়ার্ডের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব ও ৮০ নাম্বার ওয়ার্ড শ্রমিক দল সম্পাদক মিঠু।

খালেদ হাসানের মা হোসনে আরা জানান, বিভিন্ন মর্গে অজ্ঞাত লাশের খবর পেলে সেখানে ছুটে যান তিনি। খালেদ হাসানের স্ত্রী শাম্মী সুলতানা একমাত্র শিশুপুত্রকে নিয়ে এখনো অসহায়! দেশের কোন অঞ্চলে নদীতে লাশ ভেসে উঠার খবর পেলেই সেখানে ছুটে যান।

নদীতে ভেসে উঠা লাশ, মর্গে মর্গে লাশের ড্রয়ার খোলে দেখসি আমরা। কোথায়ও খালেদকে পাওয়া যায় কি না সেটাই খোজে বেড়াই। কথা গুলো বললেন, খালেদ হাসানের স্ত্রী।

অজ্ঞাত লাশের খবর পেলেই ছুটে যান বাবা

কোথায়ও অজ্ঞাত লাশ বা নদীতে লাশ ভেসে উাঠার খবর পেলেই সেখানে ছুটে যান খালেদ হাসান সোহেলের বাবা ফিরোজ উদ্দিন। ফজরের নামাজ পড়ে হাটতে গিয়ে রাস্তায় এদিক সেদিন তাকান খালেদ হাসান সোহেলের বাবা। কোথায়ও মানুষের ভীড় দেখলে এগিয়ে যান সন্তানের খোজে।

ফিরোজ উদ্দিন বলেন, ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ সারা দেশে কারাগারে খুজেছি। কোথায়ও পাই নাই। সকালে রাস্তায় বের হলে এদিক সেদিক তাকাই। ছেলেকে পাওয়া যায় নাকি দেখি! অচেনা জায়গায় কাজে গেলে সেখানেও ছেলেকে খুজি। শুধু মনে মনে ভাবি, ছেলে তো ফিরে আসবে!‘